রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে মালিবাগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কার্যালয়, পল্লবী থানা, উত্তরা, বসুন্ধরা, যাত্রাবাড়ী ও পান্থপথসহ বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। একই সন্ধ্যায় ভাটারায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি স্কুলবাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। অন্যদিকে পল্লবী থানা প্রাঙ্গণে বিস্ফোরণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
একই দিনে রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনবহুল এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এসব ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণ, আটক ৩
রোববার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে পরপর ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। টিএসসি, প্রশাসনিক ভবনসংলগ্ন এলাকা, উপাচার্য চত্বর, মধুর ক্যানটিন, নীলক্ষেতের মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ এবং শাহবাগসহ আশপাশের এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে টিএসসি এলাকায় পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের পাশে, নীলক্ষেত এবং শাহবাগ এলাকায় আরও কয়েকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
জগন্নাথ হল ও বাংলা একাডেমি এলাকার আশপাশেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্য হারুন গণমাধ্যমকে জানান, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে সাত থেকে আটটি ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
টিএসসি এলাকায় বিস্ফোরণের পর শিক্ষার্থীরা সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করে প্রক্টরিয়াল টিমের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে আরও একজনকে আটক করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রাং জানান, বিস্ফোরণের ঘটনায় সন্দেহভাজনদের আটক করার পর শাহবাগ থানা-পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। ঘটনার বিস্তারিত জানতে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাঈনুল ইসলাম রাতে জানান, ঘটনায় মোট তিনজনকে আটক করা হয়েছে।
আটক ব্যক্তিরা হলেন নাটোরের রেজাউল করিম (৪২), রাজশাহীর সোহেল রানা (৩৩) ও গোপালগঞ্জের নাজমুস সাদ (৩৩)।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বিস্ফোরণের জন্য নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে তাঁর অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত তথ্য জানানো হয়নি।
মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ের ভেতরে ককটেল বিস্ফোরণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্ফোরণের ঘটনার মধ্যেই রাজধানীর মালিবাগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান কার্যালয়ের ভেতরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মালিবাগ ফ্লাইওভারের ওপর থেকে দুর্বৃত্তরা ককটেল নিক্ষেপ করে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল আলম আরিফ জানান, ফ্লাইওভার থেকে নিক্ষেপ করা ককটেলটি সিআইডি কার্যালয়ের ভেতরে বিশেষ শাখার (এসবি) একটি গাড়ির ওপর পড়ে বিস্ফোরিত হয়।
তবে এ ঘটনায় কেউ আহত হননি।
পুলিশ জানিয়েছে, কারা ককটেল নিক্ষেপ করেছে, তা শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
পল্লবী থানা প্রাঙ্গণে বিস্ফোরণ, আহত এক সদস্য
একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর পল্লবী থানা প্রাঙ্গণেও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, মোটরসাইকেলে আসা অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তি থানার পাশের ফ্লাইওভারের ওপর থেকে একটি ককটেল নিক্ষেপ করে দ্রুত পালিয়ে যায়।
ককটেলটি থানা প্রাঙ্গণে বিস্ফোরিত হলে গেটের ভেতরে অবস্থানরত এসআরবি-৪-এর এক সদস্যের শরীরে বিস্ফোরিত অংশের ছিটা লাগে। এতে তিনি সামান্য আহত হন।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে দুর্বৃত্তরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
উত্তরা পূর্ব থানার সামনে তিনটি বিস্ফোরণের খবর
রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানার সামনেও বিস্ফোরকজাতীয় বস্তু নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের দাবি, রোববার রাতে থানার ফটকের সামনে তিনটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়।
তবে উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, আজমপুর বিআরটি সড়কের দিক থেকে থানা লক্ষ্য করে ককটেলের চেয়ে ছোট আকারের বিস্ফোরকজাতীয় বস্তু নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা।
বস্তুগুলো ছোট আকারে বিস্ফোরিত হলেও থানা পর্যন্ত পৌঁছায়নি বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, যাত্রাবাড়ী ও পান্থপথেও বিস্ফোরণের খবর
রাজধানীর আরও কয়েকটি এলাকায় একই রাতে ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া যাত্রাবাড়ীর কাজলা স্টেশনসংলগ্ন ডেমরা সড়ক এবং পান্থপথ এলাকায়ও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।
এসব ঘটনার কয়েকটি ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোর বিস্ফোরণের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনায় কেউ আহত হয়েছেন কি না, তা-ও তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
ভাটারায় স্কুলবাসে আগুন
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের পাশাপাশি ভাটারায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জলসিঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বাসটিতে আগুন দেওয়ার খবর পায় ভাটারা থানা-পুলিশ।
ভাটারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) দেবাশীস রায় জানান, স্কুলবাসে আগুন লাগার খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ সদস্যদের ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হলুদ রঙের স্কুলবাসটি আগুনে জ্বলছে। বাস থেকে ঘন কালো ধোঁয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
তবে বাসটিতে আগুন লাগার সময় কোনো যাত্রী ছিলেন কি না কিংবা এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কারা বাসটিতে আগুন দিয়েছে, সে বিষয়েও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
একাধিক ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
একই সন্ধ্যায় রাজধানীর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, থানা প্রাঙ্গণ এবং জনবহুল সড়কে বিস্ফোরণের ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সিআইডি কার্যালয় ও পল্লবী থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিস্ফোরক নিক্ষেপের ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হলেও অন্য স্থানগুলোর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তারের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত এসব বিস্ফোরণ ও ভাটারায় স্কুলবাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা একই পরিকল্পনার অংশ কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য মেলেনি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পৃথক ঘটনাগুলোর তদন্ত করছে। তদন্তের মাধ্যমে বিস্ফোরণের কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কমেন্ট করুন
সংবাদটি সম্পর্কে আপনার মতামত লিখুন। মন্তব্য প্রকাশের আগে পর্যালোচনা করা হতে পারে।